প্রাচীন যুগে এটি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ শহর ছিল। ৪০০ খ্রিস্টাব্দে টিওটিহুয়াকান সমৃদ্ধির চূড়ায় পৌঁছায়। স্থাপত্য ও শিল্পকলার কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত শহরটির আট বর্গমাইল এলাকাজুড়ে এক লাখের বেশি মানুষের বাস ছিল। ওই আট বর্গমাইল এলাকায় প্রাসাদ, মন্দির, প্লাজাসহ কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ছিল। এসব স্থাপনার চারদিকে নির্মাণ করা হয় প্রশস্ত সড়ক। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল টিওটিহুয়াকানের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা। এ ছাড়া সেনা ও পুরোহিত হিসেবে অনেকে সে সময় জীবিকা নির্বাহ করতেন। শহরটির উন্মেষের একপর্যায়ে সেখানকার মানুষ শিল্পচর্চায় আগ্রহী হন। গড়ে ওঠে শিল্পীসমাজ। তাদের আধিপত্য টিওটিহুয়াকান থেকে ছড়িয়ে পড়ে গোটা মেসোআমেরিকায়। প্রাচীন আমলের ওই শহর বর্তমানে মেক্সিকোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে বিবেচিত। টিওটিহুয়াকান শহরের যেসব স্থাপনা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে রয়েছে পিরামিড অব দ্য সান ও পিরামিড অব দ্য মুন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, পিরামিড অব দ্য সানে সূর্যদেবতার উপাসনা করতেন শহরটির বাসিন্দারা আর পিরামিড অব দ্য মুনে পশু ও নরবলি হতো। পশুবলি ও নরবলির বিষয়ে তাদের ধারণা পোক্ত হয় যখন তারা স্থাপনাটির নিচে ইগল, নেকড়ে, বনবিড়ালের পাশাপাশি ১২টি মানবদেহ পান। ওই ১২টি দেহের মধ্যে ১০টির মাথা ধড় থেকে আলাদা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে টিওটিহুয়াকান শহরের কেন্দ্রস্থল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। সম্ভবত দখলদাররা এই কাজ করে থাকতে পারে। তারা টিওটিহুয়াকানকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দেয় যে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া শহরটির পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। টিওটিহুয়াকানের বাসিন্দারা কোন ভাষায় কথা বলতেন, তারা কোথা থেকে এসেছেন এসব প্রশ্নের উত্তর প্রত্নতাত্ত্বিকরা আজও খুঁজছেন।

কাহোকিয়া

আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দে মিসিসিপি, মিসৌরি ও ইলিনয় নদীর সঙ্গমস্থলের কাছে উর্বর প্লাবনভূমিতে এক শহরের উত্থান হয়, যার নাম কাহোকিয়া। সে সময় এটি মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর ছিল। আজ আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইস শহর বলতে যাকে চিনি সেটাই প্রাচীনকালের কাহোকিয়া। শহরটিতে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষের বাস ছিল। কাহোকিয়ার কমপক্ষে ১০০টির মতো উঁচু ভবনের সন্ধান পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। শহরটির সবচেয়ে উঁচু স্থাপনার নাম মঙ্কস মাউন্ড। সন্ন্যাসীদের মরদেহের ওপর ১৪ একর জায়গা নিয়ে ৯৮ ফুট উঁচু এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। প্রাচীন যুগের এই সভ্যতা সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি। কাহোকিয়ার শাসক কারা ছিলেন, শহরটির ইতিহাস কী এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। তবে তারা নিশ্চিত, উত্তর আমেরিকায় একসময় বাণিজ্য, কারুশিল্প ও স্থাপত্যশিল্পের কেন্দ্রভূমি ছিল কাহোকিয়া। শহরটির বাসিন্দাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি মেসোআমেরিকা থেকে শুরু করে দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ১১৭৫ সালের দিকে কাহোকিয়ার বাসিন্দারা কারও কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন। হুমকিটি ঠিক কী ছিল, সে সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি। হুমকি মোকাবিলায় কাহোকিয়ানরা শহরের চারদিকে কাঠের সুরক্ষাপ্রাচীর নির্মাণ করেন। ১৩৫০ সালের মধ্যে তারা ওই শহর ছেড়ে চলে যান। তাদের শহরত্যাগের পেছনে প্রতিকূল আবহাওয়া দায়ী বলে মনে করেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

চাকো ক্যানিয়ন

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য নিউ মেক্সিকোতে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চাকো ক্যানিয়ন নামে এক শহর ছিল। ওই শহরটিতে পুয়েবলো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাস করত। চাকো ক্যানিয়নজুড়ে তারা নির্মাণ করে পাথরের বেশ কয়েকটি অট্টালিকা। এক একটি অট্টালিকায় শ-খানেক কক্ষ থাকত। অট্টালিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সুপরিচিত ছিল পুয়েবলো বোনিতো। ৮২৮ থেকে ১১২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পুয়েবলোরা ওই ভবন নির্মাণ করেন। ভবন নির্মাণের পাশাপাশি তারা কৃষিকাজ করতেন। শস্য যেমন ভুট্টা, বরবটি ও লাউ ফলাতে নদীর পানি ব্যবহার করতেন পুয়েবলোরা। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ব্যবসায়ীরা মেসোআমেরিকাসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে নানা ধরনের পণ্য এনে শহরটিতে বিক্রি করতেন। এসব পণ্যের মধ্যে কোকো যেমন থাকত, তেমনি থাকত গাঢ় লাল রঙের কাকাতুয়া। পুয়েবলোরা বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পছন্দ করতেন। চাকো ক্যানিয়নের অধিবাসীদের কোনো লিখিত ভাষা ছিল না। এ কারণে তাদের সমাজ সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, সবই তাদের সমাধি খুঁড়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা একবার মাটি খুঁড়ে এমন এক সমাধি কক্ষের সন্ধান পেয়েছিলেন যেখানে ১৩টি মরদেহ ছিল। ওইসব মরদেহ অভিজাত শ্রেণির মানুষদের ছিল কারণ তাদের মরদেহের সঙ্গে পাওয়া যায় হাজার হাজার পুঁতি, বাটি ও কলসি। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে চাকো ক্যানিয়নের মানুষ শহর ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দিকে চলে যান। এর কারণ প্রত্নতাত্ত্বিকরা সঠিকভাবে জানতে পারেননি। খরা পুয়েবলোদের শহরত্যাগের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তারা।

স্পাইরো মাউন্ডস

১৯৩৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের স্পাইরো শহরের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে এক সমাধি কক্ষের খোঁজ পান সোনা অনুসন্ধানকারীরা। ৫০০ বছর ওই কক্ষ বন্ধ ছিল। সমাধি কক্ষের ভেতরে অনুসন্ধানকারীরা মুক্তা, পুঁতি, পাইপ, কম্বলসহ বেশ কয়েকটি দামি জিনিসপত্র পান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওই আবিষ্কারের ঘটনাকে ঠাট্টা করে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রে প্রাচীন মিসরের ফারাও তুতেন খামেনের সমাধি পাওয়া গেছে। পরে ওই স্থান খনন করে ১২টি কবরস্থান, সমৃদ্ধিশালী গ্রাম, সহায়ক শহরের অংশবিশেষ পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। তাদের ভাষ্য, ওই অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক আমলে স্পাইরো মাউন্ডস নামে একটি শহর ছিল, যা সমৃদ্ধির দিক থেকে ইনকা ও আজটেক সভ্যতার সমতুল্য ছিল। স্পাইরো মাউন্ডস শহর পরিচালনাকারী সে সময় অ্যালাবামা, জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। প্রায় ১০ হাজার মানুষের বাস ছিল শহরটিতে। ওকলাহোমার স্পাইরো শহরের কাছে খোঁড়াখুঁড়ি করে বেশ কিছু শিল্পকর্মও উদ্ধার করেন প্রতœতাত্ত্বিকরা। ওই শিল্পকর্মের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, স্পাইরো মাউন্ডসের বণিক সম্প্রদায় শহর ছাড়িয়ে দূরবর্তী এলাকায় গিয়ে জিনিসপত্র বিকিকিনি করতেন। শহরটির বাসিন্দারা বেশ ধার্মিক ছিলেন। শিল্পকর্মগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের প্রতিফলন পান। মাটির বিশাল ঢিবি ও কবরস্থান দেখে তারা নিশ্চিত হন, স্পাইরো মাউন্ডস কৃষিকাজের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল ছিল। এ ছাড়া শহরটির মানুষ রাজনীতিসচেতন ছিলেন বলে মনে করেন তারা। স্পাইরো মাউন্ডসের নেতারা যে উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, তার প্রমাণ পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। শহরটির নেতারা তাদের বাড়ি সাবেক নেতাদের বাড়ির চেয়ে উঁচু জায়গায় নির্মাণ করতেন। সাবেকদের চেয়ে শহরটির বর্তমান নেতারা যে জনগণের কাছ থেকে বেশি সম্মানের দাবিদার, তা এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে রহস্যজনকভাবে স্পাইরো মাউন্স পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, দীর্ঘস্থায়ী খরা অথবা রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে শহরটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এতজানোয়া

ওয়ালনাট ও আরকানসাস নদীর সঙ্গমস্থলে একসময় এতজানোয়া নামে বিশাল এক শহরের পত্তন হয়। ২০ হাজারের বেশি জনসংখ্যার ওই শহরে উইচিটা সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করতেন। এই আদিবাসীরা উইচিটা ও কিচাই উভয় ভাষায় কথা বলতেন। এতজানোয়া শহরের নাগরিকদের আমেরিকার অন্য আদিবাসীরা মহান বসতি স্থাপনকারী হিসেবে অভিহিত করত। শহরটিতে উইচিটারা যেসব ঘরে থাকতেন, সেগুলো অনেকটা বড় মৌচাকের মতো দেখতে ছিল। এক একটি ঘরে ডজনখানেক মানুষ থাকতে পারতেন। ঘরগুলোর আশপাশে গাছ লাগাতে ভালোবাসতেন উইচিটারা। শীতকালের পুরোটা সময় তারা দলবদ্ধ হয়ে বাইসনের পাল অনুসরণ করতেন। ওই সময় বন-জঙ্গলে তারা তাঁবু খাটিয়ে থাকতেন। উইচিটাদের মধ্যে শিল্পের প্রতি বেশ আগ্রহ দেখা যায়। আমেরিকার প্রাচীন শহরগুলোর বাসিন্দাদের মতো তারাও দূর-দূরান্তে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশে যাওয়া-আসা করতেন।

সুদূর আজটেক সাম্রাজ্যের রাজধানী টেনকটিটলানের মানুষদের সঙ্গেও উইচিটাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শেষের দিকে স্প্যানিশ দখলদাররা ওই অঞ্চলে গেলে তাদের সঙ্গে উইচিটাদের দেখা হয়। উইচিটাদের সঙ্গে শুরুতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে স্প্যানিশরা। তাদের মধ্যে ভুট্টা বিনিময় হতো। পরে ১৬০১ সালে আমেরিকায় স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের অন্যতম খলনায়ক হুয়ান দে অনিয়াতের নেতৃত্বে উইচিটাদের বন্দি করা হয়। অনেক আদিবাসী সে সময় এতজানোয়া শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। তারা ফিরে এসে স্প্যানিশদের ওপর হামলা চালালে তাদের লক্ষ্য করে কামান দাগানো হয়। যে অস্ত্র উইচিটারা কখনো দেখেননি, সেটির মুখে পড়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন তারা। আবার শহর ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে কখনো তাদের আর সেখানে ফেরা হয়নি। এতজানোয়াও চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রতœতাত্ত্বিকদের ভাষ্য, আজকের যুগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস অঙ্গরাজ্যের আরকানসাস শহর যেখানে অবস্থিত, তার কাছেই ছিল উইচিটাদের সমৃদ্ধিশালী শহর এতজানোয়া।

জীবন নিয়ে উক্তি