‘টাকা পে’ কার্ড চালু করা ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ’ প্রযুক্তির কার্ড সরবরাহ করেছিল। পুরনো প্রযুক্তির এ কার্ড এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাজারে প্রায় অচল। তাই কার্ডটি ইস্যু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন। তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে ‘টাকা পে’ কার্ডটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। বর্তমান বাজারে সেটি চলবে কিনা তখন তা চিন্তা করা হয়নি। এখন নতুন করে ‘ইএমভি’ প্রযুক্তির কার্ড আনা হচ্ছে। ২০ মে পরীক্ষামূলকভাবে আটটি ব্যাংকে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। আগামী জুন থেকে কার্ডটি বাজারজাত করা সম্ভব হবে।

ভিসা-মাস্টার কার্ডের মতোই বৈশ্বিক কার্ডসেবার স্থানীয় বিকল্প হচ্ছে ‘টাকা পে’। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ অব বাংলাদেশের (এনপিএসবি) মাধ্যমে কার্ডের লেনদেন নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুললে এনপিএসবি ব্যবহার হয়। গত বছরের ১৮ জুন মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এ কার্ড চালুর ঘোষণা দেন। এরপর ৩১ অক্টোবর বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে কার্ড পরিষেবাটির উদ্বোধন করা হয়। ওইদিন সেবাটি চালু করে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক। কিন্তু উদ্বোধনের পর আর কার্যক্রমটি এগোয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাকা পের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলো “ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ” প্রযুক্তির। বর্তমান বাজারে এ কার্ড আর চলে না। এ কারণে সেটি বাজারজাত করতে পারিনি। আমরা “ইএমভি” প্রযুক্তির কার্ড চেয়েছি। সে কার্ড এলে তখন “টাকা পে” ইস্যু করা যাবে।’ প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ‘টাকা পে’ চালু করা অন্য ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারাও।

বাংলাদেশের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড বাজারের প্রায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ মার্কিন কার্ড নেটওয়ার্ক—ভিসা, মাস্টার কার্ড ও আমেরিকান এক্সপ্রেসের (অ্যামেক্স)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে দেশে ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৪২। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬০ আর ডেবিট কার্ড ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৩১ হাজার ৪৪৯টি। এছাড়া ব্যাংকগুলো ৫৪ লাখ ২৫ হাজার প্রিপেইড কার্ডও ইস্যু করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, কার্ডসেবার মাশুল বাবদ প্রতি বছরই দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে যাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই নিজস্ব কার্ডসেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ‘টাকা পে’ নামের এ কার্ড সেবা জনপ্রিয় করা গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদিশক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কার্ড ফিও কমে আসবে। কিন্তু শুরুতেই ‘ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ’-এর মতো পুরনো প্রযুক্তির কারণে কার্ডটির সম্প্রসারণ হোঁচট খেয়েছে। এ প্রযুক্তির কার্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বেশি থাকায় ব্যাংকগুলো কার্ডটি চালু করতে আগ্রহী হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাকা পের জন্য আমরা পরীক্ষামূলকভাবে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ প্রযুক্তির কার্ড এনেছিলাম। তখন খুবই অল্পসংখ্যক কার্ড আনা হয়েছিল। এখন ইএমভি প্রযুক্তির কার্ড আসছে। দেশের অনেকগুলো ব্যাংকে এখন পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। জুনে পুরোদমে “টাকা পে” কার্ড পাওয়া যাবে।’

কার্ডসেবার দিক থেকে বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেটওয়ার্ক ‘ভিসা’। ব্যাংক অব আমেরিকার হাত ধরে শুরু হওয়া আর্থিক সেবাটির বয়স ৬৬ বছরের বেশি। জনপ্রিয় আর্থিক পরিষেবা মাস্টারকার্ডের বয়সও ৫৮ বছর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ কার্ডসেবার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। ভিসা, মাস্টার কার্ড ও আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স)—এ তিনটি আর্থিক সেবা বিশ্বের কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সিংহভাগ দখলে রেখেছে। তবে এসব কার্ড পরিষেবা চীনের বাজারে অচল। দেশটি নিজেদের জনগণের জন্য ২০০২ সালে চালু করে ‘ইউনিয়নপে’। প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের এ দেশের জনগণ বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাপভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা ‘উইচ্যাট’ ও ‘ইউনিয়নপে’ কার্ড ব্যবহার করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ইউনিয়নপের বাজার শুধু চীনের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল। ওই বছর থেকে তা বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। বাংলাদেশের বাজারে ইউনিয়নপে চালুর জন্য তিনটি ব্যাংক চুক্তি করলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাফল্য আসেনি।

জীবন নিয়ে উক্তি