সন্তানের মতো লালনপালনে বড় হয়েছে বাহাদুর। শান্ত প্রকৃতির বাহাদুর ভাষা বোঝে গৃহকর্তা সহিদার রহমানের। তিনবেলা গোখাদ্যের পাশাপাশি বাহাদুর কলা, কমলা, আপেলসহ নানারকম ফলও খায়। এবার ঈদুল আজহা ঘিরে বাহাদুরকে বিক্রি করে হজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সহিদার রহমান দম্পতি। কোরবানির হাটের জন্য প্রস্তুত করা বাহাদুরকে বিক্রি করতে রাখা হয়েছে আকর্ষণীয় অফার।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের হরগোবিন্দ এলাকার কৃষক সহিদার রহমান। তিন বছর ধরে পরম যত্নে তার বাড়িতে বেড়ে উঠেছে বাহাদুর। প্রায় ২৮ মন ওজনের বিশাল আকৃতির বাহাদুরের দাম হাঁকানো হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। বাহাদুরকে কিনলে সঙ্গে একটি ফ্রিজ উপহার দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া কোরবানির আগের দিন পর্যন্ত বাহাদুরের খাওয়া-দাওয়া ফ্রিতে করানোর ব্যবস্থাসহ ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সহিদার রহমানের।

সহিদার জানান, তার শখের বাহাদুরকে লালনপালনে কোনো কমতি রাখেননি। কোনোরকম মোটাতাজাকরণ খাবার ছাড়াই শখের বাহাদুরকে সম্পূর্ণ দেশি খাবার খাইয়ে লালনপালন করা হয়েছে। ভুট্টার আটা, গমের ভুসি, ভাতসহ নিজের জমির খড় আর নেপিয়ার ঘাস রয়েছে বাহাদুরের খাদ্যতালিকায়। দৈনিক এই তালিকায় ব্যয় হত প্রায় ৭০০ টাকা। এ ছাড়া বাহাদুর দৈনিক কলা, কমলা, আপেল খায় নাস্তার মতো। শীতকালে একবেলা আর গরমকালে তিনবেলা শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো হয় বাহাদুরকে।

সহিদার আরও জানান, জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন হজ করা। স্বামী-স্ত্রী দুজন একসঙ্গে হজে যাওয়ার নিয়ত করেছেন। তবে তার আর্থিক অবস্থা সেই স্বপ্ন পূরণ করতে যথেষ্ট নয়। এ কারণে হজে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণে প্রিয় বাহাদুরকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। তার শখের বাহাদুর সন্তানের মতোই। তিনি নাতি-নাতনিদের জন্য বাজার থেকে ফলমূল কিনলে বাহাদুরের জন্যেও আনেন। মানুষের মতো বাহাদুর এখন ফলমূল খেয়ে অভ্যস্ত।

পরিবারের সদস্যদের কাছেও বাহাদুর অনেক প্রিয়। বাইরে থেকে এসে এক নজর না দেখে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করে না কেউ। বিভিন্ন সমস্যার কারণে ১১টি গরুর মধ্যে ১০টি বিক্রি করে দিলেও বাহাদুরকে রেখে দেন সহিদার। শুধু পরিবারের গৃহকর্তাদের কাছেই বাহাদুর প্রিয় নয়। প্রতিবেশীদের কাছেও অনেক প্রিয় বাহাদুর। তাই দিনের প্রায় সব সময়ই বাহাদুরকে দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসে সহিদারের বাড়িতে।

সহিদার রহমান বলেন, আমার ছোট্ট একটি খামার ছিল। সেখানে বাহাদুরের মাসহ ১১টি গরু ছিল। বাহাদুরের মা প্রতিদিন ৩০ লিটার দুধ দিত। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নানামুখী সমস্যায় পড়ে একে একে ১০টি গরু বিক্রি করে দিয়েছি। এখন শুধু বাহাদুরই আছে। শখের বাহাদুরকে বিক্রির মাধ্যমে স্ত্রীসহ হজে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলে শান্তি পাবেন বলেও জানান তিনি।

সহিদার রহমানের প্রতিবেশী ও তরুণ উদ্যোক্তা আমিরুল ইসলাম প্রায়ই বাহাদুরকে দেখতে সহিদারের বাড়িতে যান। কথা হলে তিনি বলেন, আদর্শ খামারি হতে হলে সহিদার রহমানের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ও জানার রয়েছে। তিনি গরু পালনে বেশ সফল এবং যত্নবান মানুষ। আমি তাকে দেখে অনুপ্রাণিত। আমার ভালো লাগে গরুর প্রতি উনার ভালোবাসা দেখে। বিশেষ করে যখন বাজারে দেখি উনি (সহিদার) নিজের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তার শখের বাহাদুরের জন্যও দামি ফলমূল কিনেন, এটা সত্যিই অন্যরকম ভালোলাগা। আমি চাই গরুটি বিক্রি করে হজে যাওয়ার ইচ্ছে পূরণে তিনি সামর্থ্যবান হোন।

এদিকে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে রংপুর বিভাগে পশুর চাহিদা রয়েছে ১৩ লাখ ১৮ হাজার ১১৭টি। তবে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২১ লাখ ৫২ হাজার ৩১৯টি পশু। চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে আরও আট লাখের বেশি পশু। বিভাগের আট জেলার প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬২ জন খামারির মাধ্যমে পশুগুলো পাওয়া যাবে বলে দাবি বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধা জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৫১টি পশুর চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে পশু প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৪২১টি। কুড়িগ্রামে ২ লাখ ১৬ হাজার ৫৩৩টি পশুর চাহিদার বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১টি। নীলফামারীতে ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৯টি পশুর চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে পশু রয়েছে ২ লাখ ৭৬ হাজার ২০১টি। লালমনিরহাটে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৩১টি পশুর চাহিদার বিপরীতে খামারে রয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার ৫০০টি।

দিনাজপুরে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৬টি পশুর চাহিদার বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৩০টি। ঠাকুরগাঁওয়ে ৯১ হাজার ৭৯৫টি পশুর চাহিদা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন খামারে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৬০টি। পঞ্চগড়ে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৮টি পশুর চাহিদার বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৩৭১টি। রংপুর জেলায় ২ লাখ ২০ হাজার ৩৪৪টি পশুর চাহিদার বিপরীতে বিভিন্ন খামারে পশু রয়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৮৫টি।

এ ব্যাপারে রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কোরবানির ঈদে চাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত পশু থাকবে আট লাখেরও বেশি। ঈদে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ থেকে সাধারণত উদ্বৃত্ত পশু বিভিন্ন স্থানে যায়। এর মধ্যে রংপুর অন্যতম। হাটগুলোয় যাতে অসুস্থ গরু বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য বিভাগের বিভিন্ন হাটে মেডিকেল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি হাটে আসা কোনো গরু অসুস্থ হলে মেডিকেল টিম চিকিৎসা দেবে।

মা নিয়ে উক্তি