নাম মিস্টার আলী (৫০)। পেশায় একজন ভ্যানচালক। এক যুগ ধরে নিজ অর্থে বিভিন্ন এলাকার রাস্তা মেরামত করছেন তিনি। কোনো রাস্তা ভাঙা বা গর্ত দেখলেই নিজ উদ্যোগে নেমে পড়েন তা মেরামতে। একবেলা ভ্যান চালান আর অন্য বেলায় রাস্তা মেরামতের কাজ করেন। এমনকি নিজের বাড়ি থেকে ইট খুলে নিয়ে সেই ইট দিয়েও রাস্তা মেরামত করেছেন তিনি।

মিস্টার আলীর বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের পোড়াডিহি গ্রামে। পেশায় ভ্যানচালকের পাশাপাশি তিনি গ্রামীণ সড়ক সেতু, কালভার্ট মেরামত ও সংরক্ষণের আওতায় এলসিএসের (লেবার কনট্রান্টিং সোসাইটি) একটি অস্থায়ী প্রকল্পে সুপার ভাইজার হিসেবেও কাজ করেন। তবে বেশ কিছুদিন হলো তার ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ভ্যান চালাতে পারছেন না। তবুও থেমে নেই তার রাস্তা মেরামতের কাজ।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, কোনো ভাঙা রাস্তা দেখলে রাস্তা সংস্কারের কাজে নেমে পড়েন তিনি। রাস্তা মেরামতের জন্য নিজের বাড়ির ইটও খুলে এনেছেন।

মিস্টার আলী বলেন, আমি যেখানেই ভাঙা রাস্তা দেখতেই পাই, সেখানেই মেরামত করি। আমার নেশা রাস্তা মেরামত করা। কারণ রাস্তা খারাপ থাকলে অ্যাক্সিডেন্ট বেশি হয়। আমার ঘর থেকে ইট খুলে নিয়ে সেই ইট দিয়ে রাস্তা মেরামতের কাজ করেছি। এখন ঘর না থাকার কারণে আমার ছেলের গোয়াল ঘরে থাকছি। সরকার থেকে একটি ঘর দিলে আমার খুব উপকার হতো।

মিস্টার আলীর বড় ছেলের বউ হাসিনা বেগম বলেন, আমার শ্বশুর বারো তেরো বছর থেকে রাস্তা মেরামতের কাজ করে। তার থাকার জন্য একটি ঘর ছিল সেটি ভেঙে সে রাস্তা মেরামতের কাজ করেছে। এমনকি রাস্তা মেরামতের টাকার ব্যবস্থা করার জন্য বাড়ির আঙিনায় থাকা গাছগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। ভ্যান চালিয়ে যা ইনকাম করে সব রাস্তা মেরামতের কাজে লাগায়। আমার শ্বশুর রাস্তা মেরামতের কাজ করার জন্য পাগল। যেখানেই ভাঙা রাস্তা দেখে সেখানেই মেরামত করতে শুরু করে। আমরা একটা ঘরে থাকি, আর ঘর না থাকায় শ্বশুরকে গোয়াল ঘরে থাকতে দিতে হয়েছে। তাই সরকার যদি আমার শ্বশুরকে একটা ঘর করে দিতো তাহলে খুব ভালো হতো।

মিস্টার আলীর স্ত্রী শাহাজাদি বেগম বলেন, আমার স্বামী একযুগ ধরে রাস্তা মেরামতের কাজ করছে। বাড়িতে কোনো খরচ দেয় না। যা ইনকাম করে তা রাস্তা মেরামতেই ব্যয় করে। তাছাড়া আমার এখন থাকার কোনো ঘর নাই। থাকার যে ঘরটি ছিল তা ভেঙে রাস্তা মেরামত করেছে। এখন আমরা গোয়াল ঘরে থাকছি। সরকার যদি একটা ঘর করে দেয় তাহলে খুব ভালো হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা জিন্নাত আলী বলেন, মিস্টার আলী যে ভ্যানটি চালিয়ে আয় রোজগার করতেন আর সেই ভ্যানটির ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি যদি মিস্টার আলীর ভ্যানের ব্যাটারিটি ব্যবস্থা করে দিতো তাহলে তিনি এভাবেই ভ্যান চালিয়ে রাস্তা মেরামতের কাজ করে যেতে পারতেন।

তরুণ সমাজ সেবক নাহিদুজ্জামান বলেন, মিস্টার আলী ভাঙ্গা ও গর্ত হয়ে যাওয়া রাস্তাগুলো মেরামত করেন। এটি জানার পর আমি তাকে শিবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মনিরুল ইসলামের কাছে নিয়ে যাই। পরে মেয়র মনিরুল ইসলাম তাকে কিছু টাকা ও ক্রেস্ট উপহার দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এলজিইডি থেকে একটি চাকরিও পান। বর্তমানে তার বসবাসের ঘর নেই। সে তার ছেলের গোয়াল ঘরে থাকছেন।

এলজিইডি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাহার আলী প্রাং বলেন, মিস্টার আলীকে একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তিনিএখনো কাজ করছেন। এছাড়া তিনি যেন ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে চলতে পারে সে ব্যবস্থাও আমরা করে দেব।

জীবন নিয়ে উক্তি