ওয়ানডের বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নবম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠার রেসটা জমিয়ে দিল আফগানিস্তান। গতকাল সেন্ট ভিনসেন্টের আর্নস ভেল স্টেডিয়ামে অজিদের ২১ রানে হারায় আফগানরা। যেকোনো ফরম্যাটে এটা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের প্রথম জয়।

গতকালের এ জয়ে আফগানদের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হলো। আগামীকাল শেষ ম্যাচে তারা বাংলাদেশকে হারাতে পারলে এবং আজ রাতে ভারতের কাছে অস্ট্রেলিয়া হারলে আফগানরা প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়বে। আবার আফগানদের জয়ে এখনো আশা বেঁচে আছে বাংলাদেশের! সেজন্য উজ্জীবিত এ আফগানিস্তানকে বড় ব্যবধানে হারাতে হবে। সেই সঙ্গে নাজমুল হোসেনদের প্রার্থনায় বসতে হবে যেন আজ ভারতের কাছে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়া!

এতসব সমীকরণ মিলে গেলে তবেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখা যাবে বাংলাদেশকে। সুপার এইট ‘গ্রুপ-১’-এ ভারতের পয়েন্ট ৪ (নিট রান রেট +২.৪২৫) এবং অস্ট্রেলিয়া (নিট রান রেট + ০.২২৩) ও আফগানিস্তানের (নিট রান রেট -০.৬৫০) সমান ২ পয়েন্ট। বাংলাদেশের ঝুলিতে দুই ম্যাচ শেষে শূন্য (নিট রান রেট -২.৪৮৯)।

গাণিতিক সম্ভাবনা টিকে থাকার কারণে এখনই বাংলাদেশের বিদায় লিখে দেয়া আর যাচ্ছে না। তবে সে সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। এখন আফগানরা যেভাবে সমীকরণ মেলানোর স্বপ্ন দেখছে—ভারতের কাছে অস্ট্রেলিয়া হারলে পরদিন বাংলাদেশকে হারিয়ে তারা সরাসরি উঠে যাবে সেমিফাইনালে।

আবার অস্ট্রেলিয়া যদি ভারতকে হারিয়ে দেয়, তখন ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও আফগানিস্তান—তিন দলেরই পয়েন্ট হয়ে যাবে সমান। সেক্ষেত্রে রান রেটে এগিয়ে থাকা দুই দল উঠবে সেমিফাইনালে। অজিরা যদি ১ রানে ভারতকে হারায়, তখন বাংলাদেশকে ৩৫ কিংবা তার বেশি রানে হারালেই আফগানরা নিট রান রেটে দুইয়ে উঠে সেমির টিকিট পাবে। বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে যেতে হলে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিততে হবে ৩১ রানে, এছাড়া ভারতের কাছে অস্ট্রেলিয়াকে হারতে হবে ৫৫ রানে।

গতকাল আগে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ১৪৮ রান তোলে আফগানিস্তান। রহমানউল্লাহ গুরবাজ (৪৯ বলে ৬০) ও ইব্রাহিম জাদরান (৪৮ বলে ৫১) ওপেনিং জুটিতে ১১৮ রান তুলে দেন। যদিও এ ভিত্তিটা কাজে লাগিয়ে সংগ্রহটা বড় করতে পারেনি আফগানরা। শেষ ২৫ বল থেকে তারা তুলতে পেরেছে ৩০ রান। প্যাট কামিন্সের তোপের মুখে পড়েই মূলত দেড়শর মধ্যে আটকে যায় তাদের স্কোর। চলতি বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে হ্যাটট্রিক করলেন কামিন্স। অ্যান্টিগায় শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা এ ডানহাতি পেসার গতকাল আফগানিস্তানের বিপক্ষেও টানা তিন বলে উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখান।

১৮তম ওভারের শেষ বলে রশিদ খানকে এবং ২০তম ওভারের প্রথম বলে করিম জানাত ও দ্বিতীয় বলে গুলবাদিন নায়েবকে সাজঘরে ফিরিয়ে হ্যাটট্রিকের আনন্দে ভাসেন কামিন্স। তার কৃতিত্বেই আফগানিস্তান শেষ দিকে চাপে পড়ে ১৪৮ রান তুলতে সমর্থ হয়। পঞ্চম বোলার হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে দুটি হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব দেখালেন কামিন্স। তার আগে টি-টোয়েন্টিতে দুটি হ্যাটট্রিক করেছেন শ্রীলংকার লাসিথ মালিঙ্গা, নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদি, সার্বিয়ার মার্ক পাভলোভিচ ও মালটার ওয়াসিম আব্বাস।

টানা দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় খেলোয়াড় কামিন্স। তার আগে এ কীর্তি আছে পাকিস্তান গ্রেট ওয়াসিম আকরামের। ১৯৯৯ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্টে দুটি হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি।

ডাবল হ্যাটট্রিকের (চার বলে চার উইকেট) কীর্তি গড়ার সুযোগও ছিল কামিন্সের সামনে। ডেভিড ওয়ার্নার ডিপ স্কয়ার অঞ্চলে নানজেলিয়া খারোতের ক্যাচ না ছাড়লে সেই কীর্তিও হতো। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টানা চার বলে চার উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েন আয়ারল্যান্ডের কার্টিস ক্যামফার।

এ পুঁজি নিয়েও লড়াই জমিয়ে দেন আফগান পেসাররা। ৩২ রানের মধ্যে সাজঘরে ফিরে যান ট্রাভিস হেড, মিচেল মার্শ ও ডেভিড ওয়ার্নার। সেখান থেকে দারুণ লড়াই করতে থাকেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তার ৩৫ বলের ফিফটি হয়তো মনে কাঁপন ধরায় আফগানদের। গত বছর মুম্বাইতে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ম্যাচে ১২৮ বলে খেলা তার ২০১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস অস্ট্রেলিয়াকে এনে দিয়েছিল রোমাঞ্চকর এক জয়। আফগানদের সেই ‘জুজু’ হয়তো ফিরেছিল সেন্ট ভিনসেন্টেও। তবে এবার পারলেন না ম্যাক্সওয়েল। ৪১ বলে ৫৯ রানের ইনিংস খেলে তিনি ম্যাচের নায়ক গুলবাদিনের শিকার হলেন। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে নিচু হয়ে আসা বলে দুর্দান্ত এক ক্যাচ নিয়ে ডেঞ্জারম্যানকে সাজঘরের পথ দেখান নূর আহমাদ।

ম্যাক্সওয়েলের বিদায়ের পর স্কোর দাঁড়ায় ১০৬/৬। জিততে তখন লাগে ৩২ বলে ৪৩ রান। সেন্ট ভিনসেন্টের উইকেটে তখন দারুণভাবে ঘুরছিল বল, বৈচিত্র্যও ছিল। কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে আফগানিস্তানকে জেতান সাবেক অধিনায়ক নায়েব। তাকে দারুণ সঙ্গ দেন আরেক পেসার নভীন উল হক।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় নিয়ে আফগান দলনায়ক রশিদ খান বলেন, ‘এটা দল ও দেশের জন্য অনেক বড় একটি জয়। অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর অনুভূতি দারুণ। এটা এমন কিছু, যা আমরা ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে করতে পারিনি, এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় ২০২২ বিশ্বকাপেও করতে পারিনি। এটা আমাদের দেশের জন্য এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সমর্থকদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জয়। আফগানরা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, তারা এমন একটি জয়ের অপেক্ষায় ছিল। তবে এটা আমাদের জন্য মাত্র শুরু। সেমিফাইনালে খেলার সব সুযোগ আমাদের আছে।’

মা নিয়ে উক্তি