শরতের শুভ্রতায় সাদা মেঘের আড়ালে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা। এবার সেপ্টেম্বরের প্রথম দিক থেকেই ভোর হতেই দেখা মিলছে হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপমাধুর্য।

বিনা পাসপোর্টে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কাছ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বিধৌত রূপ দেখতে বাড়তে শুরু করেছে পর্যটক। এ বছর সেপ্টেম্বরের ১০-১২ তারিখে মেঘমুক্ত আকাশে দৃশ্যমান দেখা দেয় হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা। এর মাঝখানে মেঘলা আকাশ থাকায় দেখা যায়নি। ২৭ সেপ্টেম্বর সোমবারের ভোর থেকেই আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

দেশের একমাত্র সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকেই অতি কাছ হতে দেখা যায় পৃথিবীর সুউচ্চ যুগলবন্দি পর্বতশৃঙ্গ। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে শরতের শুভ্র মেঘ কেটে সৌন্দর্যের হাতছানি দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

প্রতিবছর টেকনাফের সাগরদীপ সেন্টমার্টিন দেখতে অগণিত দেশি-বিদেশী ভ্রমন পিপাসুরা পাড়ি জমান। তেমনি উত্তরে আকাশ চুম্বী হিমালয়, মেঘকন্যা কাঞ্চনজঙঘা আর দার্জিলিংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য শোভা উপভোগ করতে বিপুল সংখ্যক পর্যটক ভ্রমন করেন ভারত ও নেপালে। সেই আকাশচুম্বী পর্বতশৃঙ্গ হিমালয়, কাঞ্চনজঙ্গা আর দার্জিলিংকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ থাকায় পর্যটকদের প্রচুর সমাগম ঘটে এ সময়ে।

এবার আগেভাগেই পর্যটন কেন্দ্রগুলোগুলোতে জমতে শুরু করেছে পর্যটকদের ভীড়। মহামারি করোনা প্রকোপের কারণে ঘরবন্দি থাকার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলে দেয়ার পর মুক্ত বিহঙ্গের মতো পর্যটকরা ছুটে আসছেন এখানে।

পর্যটকের সমাগমে ব্যস্তময় হয়ে উঠছে এ এলাকাটি। পর্যটক সমাগমে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে ব্যাটারিচালিত ভ্যান, অটোরিক্সার মতো যানবাহনগুলো ব্যস্ত সময় কাটছে। ভ্রমণ পিপাসুরা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপভোগ করছেন মোহনীয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। তারা এসেই স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছেন দুটি পর্বতশৃঙ্গের বর্ণনা।

স্থানীয়রা জানায়, দিনে বিভিন্ন রূপে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। সূর্যের আলোর সঙ্গে সঙ্গে কখনো শুভ্র, কখনো গোলাপি, আবার কখনো লাল রঙ নিয়ে হাজির হয় বরফে আচ্ছাদিত এই পর্বত চূড়া।

ভোরে আলো ফুটতেই তা গিয়ে পড়ে ঠিক কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায়। এদিকে চারপাশে তখনো আবছা অন্ধকার থাকলেও চকচক করে চূড়াটি। ভোরের আলোয় এবং বিকেলে পর্বত চূড়াটি পোড়া মাটির রঙ নেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ঝাপসা হয়ে আসে। তখন রং হয় সাদা। দূর থেকে মনে হয় এ যেন আকাশের গায়ে এক খন্ড বরফ। এ পরিবর্তন দেখতে দুরবীণ বা বাইনোকুলারের প্রয়োজন হয় না।

দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকলে এখন থেকে খালি চোখে হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। পর্বত চূড়াটির নিচ দিয়ে কালো রঙে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি এলাকা দেখা যায়।

ঢাকা, ময়মনসিংহ ও দিনাজপুর থেকে আসা কয়েকজন পর্যটক বলেন, ‘পর্যটক সেবা প্রতিষ্ঠান তেঁতুলিয়া ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম ও আবহাওয়া বার্তার খবর জেনে তেঁতুলিয়ায় ছুটে এসেছি কাছ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য।

দুদিন খুব মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। এভাবে কাছ থেকে দেখতে পাবো ভাবতেও পারিনি। খুব ভালো লেগেছে। এছাড়া এখানকার চা বাগান, জিরোপয়েন্ট, স্থলবন্দর, মহানন্দার পাথর উত্তোলন, সূর্যাস্ত ও সীমান্তের সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছে। সময় পেলে আবারও আসবো।’

বাংলা হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালিক আজিজুল হক জানান, হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। আমাদের বেশ ব্যস্ততা বেড়েছে। পর্যটকরা আমাদের এ এলাকার অতিথি, আমরা চেষ্টা করছি তাদের প্রত্যাশিত সেবা দিতে।

এদিকে পর্যটনের সময়কে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নতুন রূপে সাজানো হয়েছে এখানকার একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র ডাকবাংলো ও পিকনিক কর্ণারটিকে। নির্মাণ করা হয়েছে সুউচ্চ ওয়াচটাওয়ার। মহানন্দার তীরে স্থাপনা ভেঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে ওয়াকওয়ে ও গ্যালারি। এখানে দাঁড়িয়ে বসে ভ্রমণপিপাসুরা উপভোগ করছেন হিমালয় পর্বত, মেঘকন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা, দার্জিলিং এবং নদীর ওপারে ভারতের বিস্তৃত সবুজ চা বাগানসহ নানান দৃশ্য।

ট্যুরিস্ট পুলিশ ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম জানান, এ সময়টা পর্যটনের সময়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ যেকোন সমস্যা সমাধানে আমরা তৎপর রয়েছি। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশ টহলে রয়েছে।

অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান, পর্যটকদের জন্য হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের অন্যতম আকর্ষণ। মেঘমুক্ত আকাশে কদিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভ্রমণপিপাসুদের উপস্থিতি বেড়েছে।