কাতারে বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে প্রথমবারের মতো চারা রপ্তানি

প্রথমবারের মত সমুদ্রপথে চারা গাছ রপ্তানির সূচনা করলো বাংলাদেশ। গতকাল ৮ প্রজাতির ৩ হাজার ৭৪৭টি চারা গাছের একটি চালান উপসাগরীয় দেশ কাতারে রপ্তানির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়েছে।

চারা রপ্তানির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশ নতুনভাবে পরিচিতি পাবে বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে অপ্রচলিত এ পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ উন্মোচিত হল।

জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের থাকা মার্কস শিপিং লাইনের জাহাজ মার্কস জিয়ামেন চারা গাছের চালানটি নিয়ে আগামী সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যাবে।

কাতারে ওই চারা গাছের চালানটি পৌঁছতে ১৫-১৬ দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চালানের শিপমেন্টে নিয়োজিত সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান সেভারেল কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড।

রপ্তানির উদ্দেশ্যে কনটেইনারে লোড হওয়া ওই চারা গাছের চালানের মধ্যে রয়েছে মাল্টার চারা ৭৯৫টি, জামরুলের চারা ১৫২টি, লেবুর চারা ৯৫০টি, নিম গাছের চারা ১ হাজার ২৮০টি, বট গাছের চারা ৪০টি, সফেদার চারা ৩২০টি, কাঠ বাদামের চারা ১৭০টি এবং বাবলা গাছের চারা ৪০টি।

কাতারের দোহায় অবস্থিত বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আল নাইমি ল্যান্ডস্ক্যাপিং এই চারা গাছগুলো বাংলাদেশ থেকে কাতারে আমদানি করছে।

কুমিল্লার লাকসামের বিজরা বাজারের প্রতিষ্ঠান মেসার্স বিজরা এন্টারপ্রাইজ রপ্তানিকারক হিসেবে দুই ট্রাকে ওই চারা গাছ কুমিল্লায় তাদের নিজস্ব নার্সারি থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে।

গাছের চারাগুলো গতকাল দুপুরে পতেঙ্গার ইস্টার্ন লজিস্টিক ডিপোতে একটি ৪০ ফুটের হিমায়িত কনটেইনারে লোড করা হয়। সন্ধ্যার পর কাস্টমস ক্লিয়ারিং শেষে গতকাল রাতেই ওই কনটেইনার জাহাজীকরণ করা হয়।

চারা গাছ রপ্তানি প্রসঙ্গে বিজরা এন্টারপ্রাইজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে দেশের প্রথম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উদ্বোধন ঘোষণাকালে ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কৃষিপণ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ‘এই মার্কেট কিন্তু কোনো দিন সংকুচিত হবে না।’ ওই কথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১৮ সাল থেকে চারা গাছ রপ্তানির চেষ্টা করে যাচ্ছি।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিমানে কয়েকবার চারা গাছ রপ্তানি করলেও এবারই প্রথম সমুদ্র পথে বাংলাদেশ থেকে চারা গাছ রপ্তানি করছি। বিমানে চারা গাছ রপ্তানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই জাহাজে করে প্রচুর পরিমাণ চারা গাছ রপ্তানি শুরু করছি। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ কোটি ডলারের গাছ রপ্তানি করতে পারবো আশা রাখি।

চারাগাছ রপ্তানি প্রসঙ্গে দোহা’র প্রতিষ্ঠান আল নাইমি ল্যান্ডস্ক্যাপিং এবং কুমিল্লার মেসার্স বিজরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবু সুফিয়ান মারুফ পূর্বকোণকে বলেন, কাতারে আমরা ২০ বছর ধরে চারা গাছের ব্যবসা করছি।

২০টিরও বেশি দেশ থেকে চারা গাছ কাতারে আমদানি করে বিক্রি করি। কিন্তু এবার নিজ দেশ থেকে জাহাজে করে প্রথমবারের মতো চারা গাছ নিয়ে যাচ্ছি। এতে বিদেশের বুকে নিজের দেশের গাছ বড় হওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে পারবো। একদিন বাংলাদেশও নিজের দেশের চারা গাছ নিয়ে গর্ব করবে।

তিনি আরো বলেন, পাশের দেশ ভারতসহ ভিয়েতনাম মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে গাছ রপ্তানি করে। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই খাতে পিছিয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত নানা জটিলতা কাটিয়ে এর যাত্রা শুরু হলো। ভবিষ্যতে অনেক দেশীয় রপ্তানিকারক বাংলাদেশ থেকে চারা গাছ রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করবে বলে আশা রাখি।

এদিকে, বিশ্বে উদ্ভিদজাত পণ্য যেমন চারা গাছ রপ্তানি করতে জাতিসংঘের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলতে হয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও ওইসব নিয়মকানুন মেনে উদ্ভিদজাত পণ্য রপ্তানি করতে হয়। এ কাজের সমন্বয় করে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং।

বাংলাদেশ থেকে প্রথম সমুদ্র পথে চারা গাছ রপ্তানি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. নাসির উদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে উদ্ভিদজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করার পূর্বে আমরা ল্যাব টেস্টের পর উদ্ভিদ স্বাস্থ্য সনদ বা ফাইটোসেনেটারি সার্টিফিকেট (পিসি) ইস্যু করি।

যার মাধ্যমে ওই উদ্ভিদজাত পণ্য আন্তর্জাতিক মানের বলে ধরা হয়। এবারই প্রথম বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র পথে ৮ প্রজাতির ৩ হাজার ৭৪৭টি চারা গাছের একটি চালান কাতারে রপ্তানি হচ্ছে।

আমরা ওই চালানে চারা গাছ পরীক্ষা করেছি এবং সরেজমিনে গিয়ে কনটেইনার ভর্তি করার সময়েও মান পরীক্ষা করে দেখেছি। ওই চালানের চারা গাছগুলো নিরাপদ, পোকামাকড় ও জীবাণুমুক্ত।

তিনি আরো বলেন, কাতারে এই চালান সফলভাবে রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারে নতুন এক বাণিজ্যের পথ সৃষ্টি করলো। ভবিষ্যতেও কোন রপ্তানিকারক চারা গাছ জাতীয় পণ্য রপ্তানি করতে চাইলে আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে।

একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গনিরোধ রোগতত্ত্ববিদ সৈয়দ মুনিরুল হক পূর্বকোণ বলেন, কাতারে রপ্তানির চারা গাছগুলো দুই দফায় টেস্ট করা হয়েছে। কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে দুইবার টেস্ট করা হয়েছে।

চারা গাছগুলো সুস্থ্য, মাটি মুক্ত অবস্থায় স্টেরিলাইজড কোকো পিট-এ শিকড় গজানো অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া আমদানিকারক দেশে শর্ত অনুযায়ী চারা গাছে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়েছে। ওই গাছ রপ্তানির জন্য নিরাপদ।